fbpx
মধুর ১০ টি স্বাস্থ্যগত উপকারিতা

মধুর ১০ টি স্বাস্থ্যগত উপকারিতা

প্রাচীন কাল থেকেই মধু খাবার এবং ওষুধ উভয় হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

এতে রয়েছে উপকারী উদ্ভিদের ফুল থেকে সংগ্রহ করা প্রাকৃতিক সুমিষ্ট পানীয় এবং এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারীও বটে। তাছাড়া যারা স্বাস্থ্য সচেতন আছেন তারা রিফাইন্ড চিনির পরিবর্তে মধু ব্যবহার করতে পারেন নিশ্চিন্তে, কেননা মধু হচ্ছে ক্যালরি বিহীন খাদ্য। নিম্নে মধুর ১০ টি স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হল:

১. মধুর পুষ্টি-গত উপকারিতা

মধু

মধু হচ্ছে মিষ্টিজাতীয় একটি ঘন তরল খাবার। মৌমাছিরা ফুলে ফুলে ঘুরে মধু সংগ্রহ করে – প্রধানত বিভিন্ন ফুল জাতীয় উদ্ভিদের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে।

প্রথমে মৌমাছি বিভিন্ন ফুল থেকে এই তরল পদার্থ গ্রহণ করে, পরে তাদের পেটের মধ্যে তা হজম করে এবং তা পুনর্গঠন করে।

সবশেষে মৌমাছির পেট থেকে মৌচাকে যা জমা করা হয় সেটিই হচ্ছে মধু, যা মৌমাছিরা সঞ্চিত খাদ্য হিসাবে জমা করে রাখে। আর এই মধুর গন্ধ, রঙ এবং স্বাদ ফুলের ধরণের উপর নির্ভর করে।

মধুর পুষ্টিগুনঃ ১ টেবিল চামচ মধুতে (২১ গ্রাম) ফ্রুকটোজ, গ্লুকোজ, মাল্টোজ এবং সুক্রোজ সহ ৬৪ গ্রাম ক্যালরি এবং ১৭ গ্রাম চিনি থাকে।

মধুতে কার্যত কোন ফাইবার, চর্বি বা প্রোটিন নেই ।

মধুতে বেশ কয়েকটি ভিটামিন এবং খনিজ উপদান আছে এর মধ্য উল্লেখযোগ্য – RDI রয়েছে ১% এর ও কম তবে আপনার প্রতিদিনের প্রয়োজন পূরণ করতে বেশি পরিমাণে মধু পান করতে হবে।

এছাড়াও মধুতে রয়েছে বায়োঅ্যাকটিভ উদ্ভিদ যৌগ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান। আর পাতলা মধুর তুলনায় ঘন মধুতে এই উপাদান বেশি পরিমাণে থাকে।

২. উন্নতমানের মধুতে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ভরপুর থাকে

অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট

উন্নতমানের মধুতে রয়েছে আমাদের শরীরের জন্য উপকারী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস। এছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে অর্গানিক অ্যাসিড এবং ফ্লেভোনয়েডস এর মতো ফেনলিক যৌগগুলি।

আর তাই বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, এই যৌগগুলির সংমিশ্রণে ফলে মধুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শক্তি বৃদ্ধি পায়।

মজার বিষয় হল, দুটি গবেষণায় দেখা গেছে যদি, মধু খেলে আপনার রক্তের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে।

অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং কিছু ধরণের ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করে। এছাড়াও চোখের সুস্বাস্থ্যের জন্যও এটি উপকারী।

৩. মধু ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিনির থেকে উপকারী

ডায়াবেটিক

মধু এবং ডায়াবেটিস এর উপর গবেষণার ফল মিক্সড বলা যায়। একদিকে, মধু টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগীদের মধ্যে সাধারণ হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, এটি খারাপ LDL কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড এবং প্রদাহকে হ্রাস করতে পারে আর ভাল HDL কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে।

তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, এটি রক্তের শর্করার মাত্রাও বাড়িয়ে তুলতে পারে – তবে তা পরিশোধিত চিনির মাত্রার থেকে কম।

যদিওডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের জন্য পরিশোধিত চিনির চেয়ে মধু খানিকটা ভাল হতে পারে তবে এটি সতর্কতার সাথে খাওয়া উচিত।

এটাও মনে রাখবেন যে, মধুর সাথে প্লেইন সিরাপ মিক্সড করে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল দিতে পারে। যদিও বেশিরভাগ দেশেই খাদ্যে ভেজাল দেয়া অবৈধ, তবে তার পরেও এটি একটি বিস্তৃত সমস্যা হিসাবে রয়ে গেছে।

৪. মধুতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ব্লাড প্রেশারকে কমাতে সাহায্য করে

ব্লাড প্রেশার

ব্লাড প্রেশার হৃদরোগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ, এবং মধু ব্লাড প্রেশার কমাতে সহায়তা করে। কেননা, মধুতে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট যৌগ রয়েছে যা ব্লাড প্রেশার কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও ইঁদুর এবং মানুষ উভয়ের উপর গবেষণা থেকে জানা যায়, মধু খেলে রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেশার সামান্য হ্রাস হতে দেখা যায়।

৫. মধু উপকারী কোলেস্টেরল বাড়াতে সহায়তা করে

কোলেস্টেরল

আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন যে, উচ্চ মাত্রার LDL কোলেস্টেরল হৃদরোগের জন্য একটি শক্তিশালী ঝুঁকির কারণ।

এই ধরনের কোলেস্টেরল এথেরোস্ক্লেরোসিসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, ফলে আপনার ধমনিতে ফ্যাট বিল্ডআপ হয় যা হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের কারণ হতে পারে

তবে মজার বিষয় হল, বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে মধু আপনার কোলেস্টেরল লেভেলকে ইম্প্রুভ করতে পারে।

মধু আপনার মোট কোলেস্টেরল এবং ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল হ্রাস করতে সাহায্য করে পাশাপাশি উপকারী HDL কোলেস্টেরল বাড়াতে সহায়তা করে।

উদাহরণস্বরূপ, ৫৫ জন রোগীর উপর গবেষণায় মধু এবং এক টেবিল চামচ চিনির সাথে তুলনা করে দেখা গেছে যে, মধু ৫.৮% LDL কোলেস্টেরল হ্রাস এবং ৩.৩% HDL কোলেস্টেরল বৃদ্ধি ঘটায়।

৬. মধু ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে পারে

ট্রাইগ্লিসারাইড

এলিভেটেড ব্লাড ট্রাইগ্লিসারাইড হৃদরোগের জন্য আরেকটি ঝুঁকির কারণ।

এছাড়াও এলিভেটেড ব্লাড ট্রাইগ্লিসারাইড ইনসুলিন প্রতিরোধের সাথেও যুক্ত, টাইপ 2 ডায়াবেটিসের প্রধান চালক হিসেবে কাজ করে।

ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা চিনি এবং পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট খাবার গ্রহণে বৃদ্ধি পায়।

মজার বিষয় হচ্ছে, একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যারা নিয়মিত মধু সেবন করে তাদের ট্রাইগ্লিসারাইড লেভেল কমতে শুরু করে, বিশেষত যখন তারা মধুকে চিনির প্রতিস্থাপন হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
উদাহরণস্বরূপ, মধু এবং চিনির সাথে তুলনা করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে মধুতে ১১% এবং চিনিতে ১৯% ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা পাওয়া গেছে।

৭. মধুতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হার্টের রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী

অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট

আবারও বলছি, মধুতে প্রচুর পরিমাণে ফিনলস এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগগুলোর একটি সমৃদ্ধ উৎস। এর মধ্যে অনেকগুলো যৌগ রয়েছে যা হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সাহায্য করে।

মধুর এই উপাদানগুলো আপনার হার্টের ধমনীগুলোকে রিলাক্স করতে সাহায্য করে, আপনার হার্টের রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে তোলে। এছাড়াও এই উপাদানগুলো হার্টে রক্ত জমাট বাধা রোধেও সহায়তা করতে পারে, আর রক্ত জমাট বাধলে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।

আর ইঁদুরের উপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মধু হার্টকে ক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে থাকে।

৮. মধু পোড়া এবং ক্ষত নিরাময় করে

ক্ষত নিরাময়

সেই প্রাচীন মিশরিও সময় থেকে মধু আজও ক্ষত এবং পোড়া নিরাময়ের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

মধু এবং ক্ষতের যত্ন নিয়ে ২৬ টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, পোড়া স্থান এবং ক্ষত স্থান (অপারেশনের ক্ষত) এর নিরাময়ের জন্য মধু সবচেয়ে কার্যকর।

এছাড়াও ডায়াবেটিসের ফলে পায়ে আলসার রোগের একটি কার্যকর চিকিৎসা হচ্ছে এই মধু।

একটি গবেষণায় ক্ষতের চিকিৎসা হিসাবে মধুর সাফল্যের হার ৪৩.৩% পর্যন্ত রিপোর্ট করা হয়েছে। অন্য আরেকটি গবেষণায় ডায়াবেটিস আলসার রোগীদের মধু সেবনের মাধ্যমে ৯৭% নিরাময় সম্ভব বলে দাবি করা হয়েছে।

গবেষকরা বিশ্বাস করেন মধুর রোগ নিরাময় করার ক্ষমতাগুলো এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি যৌগের কারণে হয়ে থাকে এবং এর সাথে মধুতে শরীরের টিস্যু গুলোকে পুষ্ট করার ক্ষমতাও রয়েছে।

এগুলো ছাড়াও, মধু সোরিয়াসিস এবং হার্পিসের ক্ষত সহ অন্যান্য ত্বকের চিকিৎসায় খুবই কার্যকর।

৯. মধু শিশুদের কাশি দমন করতে সহায়তা করে

শিশুদের কাশি

শিশুদের ঠান্ডা কাশি জনিত সমস্যা যেন মনে হয় মজ্জাগত, প্রত্যেকটি শিশুই এই সমস্যার সম্মুখীন হয় কিন্তু তারা ছোট থাকায় প্রকাশ করতে পারে না।

ফলে রাত নেই দিন নেই শিশু কান্নাকাটি করে, খাওয়া দাওয়ায় অনীহা প্রকাশ করে ফলে বাচ্চার চিন্তায় বাবা মায়ের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

তবে কাশির জন্য বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ সবসময় কার্যকর হয় না এবং ছোট বাচ্চাদেরকে এই ওষুধ সেবনের কারণে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, ওষুধের থেকে বাচ্চাকে মধু খাওয়ানো উত্তম হবে এবং মধুর বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায় মধু কাশির চিকিৎসায় খুবই কার্যকর।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে দুটি সাধারণ কাশির ওষুধের চেয়ে মধু আরও ভাল কাজ করেছে।

অন্য আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, এটি কাশির লক্ষণগুলো হ্রাস করেছে এবং কাশির ওষুধের তুলনায় ঘুমের উন্নতি করেছে।

তবুও হজম জনিত সমস্যার কারণে এক বছরের কম বয়সী বাচ্চাদেরকে মধু খাওয়ানো উচিত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন।

১০. মধু খুবই সুস্বাদু এবং ক্যালোরিতে ভরপুর

মধুকে চিনির বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায়, যা খুবই সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর।

তাই প্রাকৃতিক মধু এবং পিউর মধু বাছাই করে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করুণ, কারণ কিছু নিম্ন মানের মধুতে সিরাপ মিশ্রিত করে কম মূল্যে বাজারজাত করে।

মনে রাখবেন, সকল খাদ্যই পরিমিতভাবে খাওয়া উচিত মধুও এর ব্যতিক্রম নয়, কারণ মধুতে ক্যালোরি এবং সুগারের পরিমাণ বেশি রয়েছে।

অস্বাস্থ্যকর মিষ্টিজাতীয় খাবারের পরিবর্তে মধুর ব্যবহার অনেক উপকারী যা ইতিমধ্যে আপনাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

Sign In

* By logging in, you agree to our Terms of Use and to receive SornoRenu emails & updates and acknowledge that you read our Privacy Policy.

%d bloggers like this: